সংসদে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে সোচ্চার ফজলুর রহমান
মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানোর দাবি, হাওরের উন্নয়ন ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক :
জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বৃদ্ধি, হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন, সংস্কৃতির বিকাশ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং মাজার-ঐতিহ্য সংরক্ষণের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা দেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই অন্য যেকোনো সম্মানী ভাতার তুলনায় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা অন্তত এক টাকা হলেও বেশি হওয়া উচিত।
বৃহস্পতিবার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বাজেটে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ২০ হাজার টাকা এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ২৫ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের জন্য বিভিন্ন হারে ভাতার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের অবদানকে সম্মান জানিয়েই বলছি, মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা করা উচিত নয়। এটি জাতির অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
ফজলুর রহমান আরও বলেন, দেশের অধিকাংশ বিএনপি নেতা-কর্মী ও সংসদ সদস্য জনগণের কাছে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচয় দেন। সেই বাস্তবতায় মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আজকের সিদ্ধান্তের জবাব হয়তো পাঁচ বছর পর দিতে হতে পারে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির মধ্যে ভারসাম্য চাইলেন
বাজেটে শিক্ষা খাতে বড় বরাদ্দের প্রশংসা করলেও সংস্কৃতি খাতে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দেওয়ার সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষায়, “ভাত আর তরকারির যেমন সম্পর্ক, শিক্ষা ও সংস্কৃতির সম্পর্কও তেমন।” তিনি বলেন, শুধুমাত্র শিক্ষা দিয়ে একটি সভ্য সমাজ গড়া সম্ভব নয়। সংস্কৃতি, সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও লোকজ ঐতিহ্য মানুষের মানবিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য।
গ্রামীণ বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একসময় দুর্গাপূজা উপলক্ষে গ্রামে গ্রামে নাটক হতো, যাত্রাপালা হতো, কৃষকরা মাঠের কাজ শেষে চাদর গায়ে দিয়ে রূপবানের গান দেখতে যেতেন। এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সমাজে সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলত। কিন্তু বর্তমানে কিছু গোষ্ঠী এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
উগ্রবাদ ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে কড়া বক্তব্য
ফজলুর রহমান বলেন, কিছু গোষ্ঠী সমাজকে মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার দিকে নিয়ে যেতে চায়। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন এমন কথাও শোনা যায় যে ফুটবল খেলা দেখা যাবে না, বিদেশি দলের সমর্থন করা যাবে না। এসব সংকীর্ণ চিন্তা জাতিকে পিছিয়ে দেবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দেশ। এখানে খেলাধুলা, সাহিত্য, সংগীত, নাটক ও উৎসব মানুষের জীবনের অংশ। এসবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে সমাজের স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করা।
সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা
সংসদীয় রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কার্যকর বিতর্ক ও জবাবদিহিতা থাকা জরুরি। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা বা সমঝোতার রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। তিনি ফুটবল খেলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি মানুষ মনে করে খেলাটি শুধুই “ফ্রেন্ডলি ম্যাচ”, তাহলে একসময় মাঠ ফাঁকা হয়ে যাবে। সংসদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।
হাওরের উন্নয়নে পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি
হাওরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের অবহেলার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি হাওর উন্নয়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানান। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাতিল হওয়া ছয় হাজার কোটি টাকার উড়াল সড়ক প্রকল্প পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষ বছরের পর বছর যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের নানা সমস্যার মধ্যে বসবাস করছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো সম্ভব।
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে ফজলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি মনে করেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে—এটাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।
তিনি বলেন, “হিন্দুরা তাদের মন্দিরে পূজা করবে, মুসলমানরা মসজিদে নামাজ পড়বে—এতে কারও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।”
সুফিবাদ ও মাজার সংস্কৃতি রক্ষার দাবি
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক মাজার ও সুফি ঐতিহ্য রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, হযরত শাহজালাল, শাহপরাণ, বায়েজিদ বোস্তামী ও খান জাহান আলীর মতো আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, এঁদের শিক্ষা ছিল মানবতা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা।
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কিছু গোষ্ঠী মাজার ও সুফি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। অথচ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এসব আধ্যাত্মিক কেন্দ্র মানুষের মধ্যে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধের বার্তা ছড়িয়ে আসছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংস্কৃতির বিকাশ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, হাওরাঞ্চলের উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক চর্চার বিষয়গুলোকে একসঙ্গে তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা রক্ষার পাশাপাশি বহুত্ববাদী ও সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।




