বিআরবি ক্যাবলসের নামে নকল তারের ছড়াছড়ি: জননিরাপত্তার জন্য ভয়ংকর হুমকি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বৈদ্যুতিক ক্যাবল বাজারে সবচেয়ে বেশি নকল হওয়া ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম বিআরবি ক্যাবলস। বছরের পর বছর ধরে রাজধানীর নবাবপুর থেকে শুরু করে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিআরবি ক্যাবলসের নাম ও মোড়ক ব্যবহার করে নিম্নমানের এবং ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক তার উৎপাদন ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিএসটিআইয়ের একাধিক অভিযানে এসব নকল তার তৈরির কারখানা ও বিক্রয়কেন্দ্রের সন্ধান মিললেও অসাধু চক্রটি বারবার সক্রিয় হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নবাবপুরে এক অভিযানে বিপুল পরিমাণ নকল বিআরবি পিভিসি ক্যাবল জব্দ করা হয়। সিফাত আব্দুল্লাহ মার্কেট ও খান সমীর মার্কেটে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ১ হাজার ৩৮০ কয়েল নকল বিআরবি ক্যাবল উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিন ব্যবসায়ীকে মোট তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে দেখা যায় বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক সিএম লাইসেন্স ছাড়াই বিআরবি ব্র্যান্ডের নামে পিভিসি ক্যাবল তৈরি, গুদামজাত ও বাজারজাত করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, নকল তারের গায়ে অবৈধভাবে গুণগত মানের সনদ ও লেবেল ব্যবহার করা হচ্ছিল। আদালত এসব নকল তার ধ্বংসের নির্দেশ দেন।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে নকল বিআরবি তারের কারখানা
২০২৪ সালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে একটি বিশাল নকল বৈদ্যুতিক তার তৈরির কারখানার তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় থানার অদূরেই গড়ে ওঠা ওই কারখানায় রাতভর বিআরবি ক্যাবলসসহ বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল তার উৎপাদন করা হতো।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সেখানে উন্নতমানের তামার পরিবর্তে নিম্নমানের লোহার চিকন তার ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক ক্যাবল তৈরি করা হচ্ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, লোহার তার সহজেই মরিচা ধরে, ভেঙে যায় এবং বিদ্যুৎ পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ফলে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, অধিক মুনাফার আশায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র বিআরবি ক্যাবলসের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে দীর্ঘদিন ধরে এসব নকল তার উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছে। ফলে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের অজান্তেই ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করছেন।
নোয়াখালীতে নকল বিআরবি ক্যাবল বিক্রি, জরিমানা
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নোয়াখালীর চৌমুহনীতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে বিআরবি ক্যাবলের মোড়ক ব্যবহার করে নকল তার বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়। চৌমুহনী হকার্স মার্কেটের একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
ভোক্তা অধিকার কর্মকর্তারা জানান, আসল বিআরবি ক্যাবলের মোড়ক লাগিয়ে নিম্নমানের তার বিক্রি করা হচ্ছিল, যা সরাসরি ভোক্তা প্রতারণার শামিল।
যাত্রাবাড়ীতে নকল তার কারখানায় র্যাবের অভিযান
এর আগেও রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে আজিজ ক্যাবলস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে র্যাব বিপুল পরিমাণ নকল বৈদ্যুতিক তার জব্দ করে। অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটি বিআরবি ক্যাবলস, বিবিএস, পলয় এবং অন্যান্য জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামে নকল তার উৎপাদন করছে।
র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে ৪২ লাখ টাকা জরিমানা করে এবং ১২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে। এছাড়া প্রায় এক কোটি টাকার নকল বৈদ্যুতিক তার জব্দ করা হয়।
তদন্তে জানা যায়, একটি বিশেষ প্রিন্টিং মেশিন ব্যবহার করে সহজেই নকল তারের গায়ে বিআরবি ক্যাবলসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ছিল চক্রটি।
অগ্নিকাণ্ডের বড় কারণ নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে সংঘটিত অধিকাংশ অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও শর্টসার্কিট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নমানের ও নকল বৈদ্যুতিক ক্যাবল ব্যবহারের ফলে শর্টসার্কিটের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
রাজধানীর বহুল আলোচিত এফআর টাওয়ার অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে শর্টসার্কিটকে আগুনের সূত্রপাতের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় আগুন লাগার পেছনেও নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহারকে দায়ী করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে শর্টসার্কিটজনিত দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত বেশি। বাজারে নকল ও মানহীন বৈদ্যুতিক ক্যাবল, সার্কিট ব্রেকার ও অন্যান্য সরঞ্জাম সহজলভ্য হওয়ায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
জননিরাপত্তার জন্য কঠোর ব্যবস্থা জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিআরবি ক্যাবলসের মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের নামে নকল পণ্য তৈরি শুধু একটি ব্যবসায়িক অপরাধ নয়; এটি জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। কারণ এসব নকল তার ব্যবহার করে নির্মিত বৈদ্যুতিক সংযোগ যে কোনো সময় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
তারা মনে করেন, নকল তার উৎপাদনকারী কারখানা ও বাজারজাতকারী চক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি এবং বাজার তদারকি জোরদার না হলে এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে ক্রেতাদেরও বিএসটিআই অনুমোদিত ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে বৈদ্যুতিক ক্যাবল কেনার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
দেশজুড়ে একের পর এক অভিযানে যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে স্পষ্ট—নকলকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে বিআরবি ক্যাবলস। আর এই অবৈধ ব্যবসা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে জননিরাপত্তা আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।




