দুই মাসে হামে মৃত্যু ৪৫১, আক্রান্ত ৬৩ হাজার ছাড়াল; দেশজুড়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
গাজী তুষার আহমেদ :
দেশে হাম পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত মাত্র দুই মাসে সারা দেশে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ২৭ জনে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৪৫১ জন শিশুর, যা দেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (সর্বশেষ একদিনে) আরও ১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জনের ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর বাকি ৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল। একই সময়ে নতুন করে শত শত রোগী শনাক্ত হয়েছে, ফলে হাসপাতালে রোগীর চাপ আরও বেড়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, প্রতিদিনই নতুন রোগী আসায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দুই মাসের তথ্যে দেখা যায়, আক্রান্তদের বড় একটি অংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। মোট ৪০ হাজার ১৭৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে, যার মধ্যে ৩৬ হাজার ৫৫ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট, অতিরিক্ত ভিড় এবং পর্যাপ্ত আলাদা ওয়ার্ড না থাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন।
মৃত্যুর বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৪৫১ জন শিশুর মধ্যে ৭৪ জনের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর ৩৭৭ জনের ক্ষেত্রে হামের উপসর্গ ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে আনা, পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকা এবং টিকাদান কাভারেজ কম থাকা এই মৃত্যুর হার বাড়ানোর বড় কারণ হতে পারে।
বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। এরপর রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে। খুলনা ও রংপুর বিভাগে তুলনামূলকভাবে আক্রান্ত কম হলেও রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
হাসপাতাল পরিস্থিতি নিয়ে চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক জায়গায় রোগীর চাপ স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি। কোথাও ১০টি শয্যার বিপরীতে ৪০–৫০ জন রোগী পর্যন্ত চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে শুধু চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে না, বরং একজন রোগী থেকে অন্য রোগীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিশুদের ক্ষেত্রে হালকা জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। তারা সতর্ক করেছেন, অবহেলা করলে জটিলতা বাড়তে পারে এবং মৃত্যু ঝুঁকিও তৈরি হয়। একইসঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের সময়মতো হাম (Measles) টিকা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
এদিকে, পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় জনমনে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে কিছু দাবির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো গুজব নয়, বরং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা মেনে চলা, টিকাদান জোরদার করা এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।




