ভ্যাটের নামে ভয়ভীতি, ঘুষের বাণিজ্য: অসাধু কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসা, বঞ্চিত রাষ্ট্র
নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশ গড়তে কর ও ভ্যাট পরিশোধ নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই ভ্যাট আদায়ের দায়িত্বে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা ঘুষ, চাঁদাবাজি ও ভয়ভীতিকে হাতিয়ার বানান, তখন শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না—রাষ্ট্রও হারায় তার ন্যায্য রাজস্ব।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভ্যাট অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, অতিরিক্ত টাকা দাবি, নিবন্ধনের নামে ঘুষ গ্রহণ এবং মিথ্যা মামলার ভয় দেখানোর অভিযোগ নতুন নয়। বরগুনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত ভ্যাটমুক্ত সীমার মধ্যেও তাদের বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। কোথাও অফিস খরচের নামে, কোথাও নিবন্ধন ফি’র আড়ালে, আবার কোথাও সরাসরি ঘুষের দাবি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে মাগুরায় একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির ঘটনায় দুই ভ্যাট কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভুয়া কর ফাঁকির মামলা দেখিয়ে তারা মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায়ের চেষ্টা করেন। একইভাবে চট্টগ্রামেও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগে এক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে অসাধু কর্মকর্তা ও ভ্যাট ফাঁকিদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গোপন সমঝোতা গড়ে ওঠে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়, আর সৎ ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের কোটি কোটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বড় অংশ এখনো কার্যকর ভ্যাট নেটওয়ার্কের বাইরে। অথচ নতুন ভ্যাটদাতা খুঁজে বের করার পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে। এতে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, অন্যদিকে ভোক্তাদের ওপরও অতিরিক্ত ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দুর্নীতিগ্রস্ত ভ্যাট কর্মকর্তারা শুধু ঘুষের মাধ্যমে ব্যক্তিগত সম্পদ গড়ছেন না, তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। ভ্যাটের টাকা উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু সেই অর্থ যদি দুর্নীতির পকেটে চলে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো দেশ।
এখন সময় এসেছে ভ্যাট ব্যবস্থাকে শতভাগ অটোমেশনের আওতায় আনা, নগদ লেনদেন বন্ধ করা এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের। একইসঙ্গে প্রকৃত ভ্যাটদাতাদের হয়রানি বন্ধ করে করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।
রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে ভ্যাট দিতে হবে, কিন্তু ভ্যাটের নামে ঘুষ-চাঁদাবাজির সংস্কৃতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দুর্নীতিমুক্ত রাজস্ব প্রশাসনই পারে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে।




