ব্রেকিং নিউজ
টানা তিন ম্যাচে তিনবারই ম্যাচসেরা ভিনিসিয়ুস ভিনির তিন ম্যাচেই গোল : ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি? ৩২ মাস পর ব্রাজিল জার্সিতে নেইমারের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন, হার্ড রকে উৎসব ভিনিসিয়ুসের জোড়া গোল, নেইমারের আবেগঘন প্রত্যাবর্তন; স্কটল্যান্ডকে উড়িয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল বেইজিংয়ের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দালিয়ানে ডব্লিউইএফ সম্মেলন: জলবায়ু ও বিনিয়োগ নিয়ে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাংবাদিকেরা ‘আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা’ যুবদল নেতার বিতর্কিত মন্তব্য, ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় রাজধানীতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে এক দিনে ২ হাজার ৩২৩ মামলা, শীর্ষে মিরপুর

তোফায়েল আহমেদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন:

Gazi Tushar Ahamed বাংলাদেশ
AdvertisementAdvertisement


গাজী তুষার আহমেদ :

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তোফায়েল আহমেদ আর নেই। সোমবার (১ জুন ২০২৬) বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা। তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মৌলভী আজহার আলী এবং মাতা ফাতেমা বেগম।
তিনি ১৯৬০ সালে ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৬২ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মৃত্তিকাবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
ছাত্ররাজনীতিতে উত্থান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৬৬-৬৭ সালে তিনি ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি ছিলেন।
১৯৬৮-৬৯ সালের গণআন্দোলনে তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পাকিস্তানি শাসনবিরোধী আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।
বঙ্গবন্ধু উপাধি ঘোষণার ঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জনসভায় লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তোফায়েল আহমেদ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনাকে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠিত হন।
মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। এরপর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুজিব বাহিনীর চারজন আঞ্চলিক প্রধানের একজন ছিলেন তিনি। স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ।
রাষ্ট্র পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ সদস্য হিসেবে দীর্ঘ পথচলা
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের অন্যতম দীর্ঘ সময়ের সংসদ সদস্য ছিলেন। তিনি মোট ৯ বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে দীর্ঘদিন এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন
১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
পরবর্তীতে ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নে তিনি ভূমিকা রাখেন।
কারাবরণ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
রাজনৈতিক জীবনে বহুবার কারাবরণ করতে হয়েছে তোফায়েল আহমেদকে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি টানা ৩৩ মাস কারাগারে ছিলেন।
সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে
দীর্ঘদিন ধরে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।
রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বের কারণে তিনি দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছিলেন।
এক যুগের অবসান
তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। ছাত্র আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
একজন ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলায় তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন একজন সংগ্রামী নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।

AdvertisementAdvertisement

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।