“টিকা সংকটের দায়ে ইউনূসকে ঘিরে মামলা খারিজ—আইনের সমতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন”
নিজস্ব প্রতিবেদক :
হাম ও রুবেলা টিকার সময়মতো আমদানি না করা এবং এর ফলে শিশু মৃত্যুর অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আদালত। এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করেছিল, টিকা ব্যবস্থাপনায় গড়িমসি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক শিশু মারা গেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।
তবে আদালত শুনানি শেষে মামলার আবেদন গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ বা বিস্তারিত কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হলেও, এই খারিজকে কেন্দ্র করেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ নিজের ফেসবুক পোস্টে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে—অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা আদালত গ্রহণ করলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাবেক কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ না হওয়ায় সমতার প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিচার ব্যবস্থায় যদি সবার জন্য সমান নীতি থাকে, তবে সব ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: শিশু মৃত্যু ও টিকা সংকট
মামলার আবেদনকারীরা দাবি করেন, টিকা সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার কারণে বহু শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে। তাদের মতে, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি ছিল এবং দায় নির্ধারণের জন্য বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, এমন সংবেদনশীল বিষয়ে মামলা গ্রহণ বা খারিজের সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র আইনগত ভিত্তি ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করা উচিত, রাজনৈতিক বা আবেগপ্রসূত ব্যাখ্যার ওপর নয়।
বিতর্কের মূল প্রশ্ন
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
মামলার আবেদন খারিজের সিদ্ধান্ত কি সম্পূর্ণ আইনগত ছিল?
জনস্বাস্থ্য সংকটে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় কতদূর পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা যায়?
রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের মানদণ্ড কীভাবে নির্ধারিত হয়?
আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে?
বিশ্লেষণ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মামলার আবেদন গ্রহণ বা খারিজের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে আদালত অভিযোগের প্রাথমিক ভিত্তি, প্রমাণের সম্ভাবনা এবং আইনগত গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করে। সব অভিযোগই বিচারিক পর্যায়ে যাওয়ার মতো ভিত্তি নাও থাকতে পারে।
তবে জনমনে যখন উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতা ও সমতার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার আবেদন খারিজ শুধু একটি আইনগত সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি এখন একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আইন সবার জন্য সমান কি না—এই পুরোনো প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
এই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ায়, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বিচারিক ব্যাখ্যা, তদন্তের অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার ওপর।




