পিতা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ অথচ জামায়াতের এমপি জন্মেছেন ১৯৮১ সালে
নীলফামারী প্রতিনিধি :
নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম-এর জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। তার পারিবারিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখিত জন্মতথ্যের অসঙ্গতি নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকরা।
সংসদে কী বলেছিলেন আব্দুল মুনতাকিম?
জাতীয় সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে আব্দুল মুনতাকিম বলেন,
“আমার বাবা, আমার দাদা যুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) ৭ ভাই, ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক।”
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধে নিজের পরিবারের ব্যাপক অবদান তুলে ধরেন এবং মুক্তিযুদ্ধকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেন।
কোথা থেকে শুরু বিতর্ক?
সংসদে দেওয়া বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই আব্দুল মুনতাকিমের নির্বাচনী হলফনামা ও প্রকাশ্য তথ্য খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
সমালোচকদের দাবি, তার নির্বাচনী হলফনামা এবং বিভিন্ন উন্মুক্ত তথ্যসূত্রে জন্মতারিখ হিসেবে ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি উল্লেখ রয়েছে। সে হিসেবে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় এক দশক পরে জন্মগ্রহণ করেন।
এখানেই প্রশ্ন উঠেছে—যদি তার বাবা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে থাকেন, তাহলে ১৯৮১ সালে জন্ম নেওয়া আব্দুল মুনতাকিমের পিতা কে?
এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের সূত্রপাত।
সমালোচকদের যুক্তি
বিষয়টি নিয়ে সমালোচকরা কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যার কথা তুলে ধরছেন—
সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি হয়তো পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়ে অস্পষ্ট ভাষা ব্যবহার করেছেন।
“বাবা শহীদ” বলতে জৈবিক পিতার পরিবর্তে অভিভাবকতুল্য কোনো আত্মীয় বা পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে বোঝাতে চেয়েছেন কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।
অথবা বক্তব্যের কোনো অংশ ভুলভাবে উপস্থাপিত বা উদ্ধৃত হয়েছে কি না, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আব্দুল মুনতাকিমের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী মতের রাজনীতিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা বক্তব্যটির সত্যতা যাচাইয়ের দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে তার সমর্থকদের দাবি, বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট না জেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে, মুক্তিযুদ্ধে পরিবারের সদস্যদের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের বিষয়টি যাচাই না করে শুধুমাত্র জন্মসালকে কেন্দ্র করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
তথ্য যাচাইয়ের দাবি
বিতর্কের পর সংশ্লিষ্ট মহল থেকে কয়েকটি তথ্য প্রকাশের দাবি উঠেছে—
আব্দুল মুনতাকিমের পারিবারিক বংশতালিকা;
তার পিতা ও অন্যান্য শহীদ বা মুক্তিযোদ্ধা আত্মীয়দের পরিচয়;
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দাবি করা পরিবারের সদস্যদের সরকারি স্বীকৃতির তথ্য;
সংসদে দেওয়া বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ও লিখিত প্রতিলিপি।
উপসংহার
জাতীয় সংসদে দেওয়া একটি বক্তব্যকে ঘিরে আব্দুল মুনতাকিমের পারিবারিক ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে তার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা, সরকারি নথি এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সামনে এলে বিতর্কের প্রকৃত সত্যতা আরও স্পষ্ট হবে।




