সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের কটূক্তি থামছে না কেন
ডেস্ক রিপোর্ট:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মত প্রকাশ, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্ত তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। তবে এই ভার্চ্যুয়াল জগৎ নারীদের জন্য অনেক সময় নিরাপদ থাকছে না। প্রতিদিন অসংখ্য নারী অনলাইনে কটূক্তি, সাইবার বুলিং, অপপ্রচার ও মানসিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সম্প্রতি শিশুদের অপুষ্টি, অসচেতনতা ও মায়ের বুকের দুধ না পাওয়ার বিষয়ে একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর নারীদের লক্ষ্য করে ব্যাপক কটূক্তি শুরু হয়। শুধু মতামত প্রকাশ নয়, নারীর পেশা, জীবনযাপন, অবসর কাটানোর ধরন নিয়েও নানা ধরনের বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করা হয়। প্রশ্ন উঠছে—আইন ও সচেতনতা বৃদ্ধির নানা উদ্যোগ থাকার পরও কেন অনলাইনে নারীদের হেনস্তা এত সহজ হয়ে উঠছে?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএর ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতা, সাইবার বুলিং বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা। তাঁরা বেশি আক্রান্ত হন অপপ্রচার, ব্ল্যাকমেল ও অশালীন বার্তার মাধ্যমে।
ইউএন উইমেনের তথ্যমতে, সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও কম কোনো ধরনের সহায়তা চান। আর পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন ১০ শতাংশেরও কম নারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা পরিবার বা বন্ধুদের ওপর নির্ভর করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল হয়রানির প্রভাব শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি একজন নারীর মানসিক স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও পেশাগত জীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অনেক সময় অনলাইন হয়রানি বাস্তব জীবনে স্টকিং, শারীরিক সহিংসতা কিংবা প্রাণনাশের ঝুঁকিও তৈরি করে।
বিশ্ব পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। ইউএন উইমেনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ১৬ থেকে ৫৮ শতাংশ নারী কোনো না কোনোভাবে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ১৫ বছর বয়সের পর প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী সাইবার হয়রানির মুখোমুখি হয়েছেন। আরব অঞ্চলে প্রায় ৬০ শতাংশ নারী ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গত এক বছরে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ৭৩ শতাংশ নারী সাংবাদিকও অনলাইন আক্রমণের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে ডিপফেক ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে নারীদের হয়রানির ঘটনা বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা অধিকাংশ ডিপফেক কনটেন্টে নারীদের আপত্তিকরভাবে উপস্থাপন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনের প্রয়োগ দুর্বল হওয়া, সামাজিক মানসিকতার সংকট, অনলাইনে পরিচয় গোপনের সুযোগ এবং নারীবিদ্বেষী মনোভাব—এসব কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের কটূক্তি সহজ হয়ে উঠেছে। তাই শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার এবং প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা।




