লালমনিরহাটে শিশু হত্যার পর রণক্ষেত্র : প্রশাসন অবরুদ্ধ—এসপি-ওসিসহ আহত ৩০
লালমনিরহাট প্রতিনিধি :
লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলায় নিখোঁজ এক শিশুর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ জনতার হামলা-ভাঙচুর ও সংঘর্ষে জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা অবরুদ্ধ হন এবং পুলিশ সুপার (এসপি), থানার ওসিসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রামে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী এই সহিংস পরিস্থিতিতে পুরো এলাকা কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
নৃশংস হত্যাকাণ্ডে উত্তাল গ্রাম
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকেল থেকে সাত বছর বয়সী শিশু নন্দিনী কান্ত রায় নিখোঁজ ছিল। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান পাননি।
পরদিন সকালে বাড়ির পাশে একটি ভুট্টাক্ষেতে সদ্য খোঁড়া মাটি দেখে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে সেখানে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
দুইজন আটক, সন্দেহ ঘিরে উত্তেজনা
ঘটনার পর স্থানীয়দের সন্দেহের ভিত্তিতে পুলিশ রণজিৎ কুমার ও তার ছেলে বিধান চন্দ্র রায় (২২)-কে আটক করে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আটক বিধানকে এক প্রতিবেশী আগের দিন ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখেছিলেন। এই তথ্য ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে।
পুলিশ হেফাজতেও হামলা, শুরু মব সহিংসতা
মঙ্গলবার দুপুরে উত্তেজিত জনতা বিধানের বাড়িতে হামলা চালায়। পুলিশ তাকে হেফাজতে নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।
অভিযুক্তকে “তৎক্ষণাৎ শাস্তি” দেওয়ার দাবিতে জনতা পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং একপর্যায়ে পুলিশকে ঘিরে ফেলে অবরুদ্ধ করে রাখে।
প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের টিমও অবরুদ্ধ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, বিজিবি অধিনায়কসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে যান।
কিন্তু উত্তেজিত জনতা তাদের গাড়ি আটকে দেয় এবং একপর্যায়ে প্রশাসনিক টিমকেও অবরুদ্ধ করে ফেলে।
সংঘর্ষে আহত বহু, গাড়ি ভাঙচুর
প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে।
এরপর অভিযুক্তদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু হয়। এতে এসপি, ওসিসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন।
এ সময় জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ অন্তত ৭টি সরকারি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি নিজেও আহত হয়েছেন বলে জানান।
ঘটনার পর আদিতমারী থানার ওসিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি
জেলা প্রশাসক জানান, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারে না।
শেষ কথা
একদিকে শিশু হত্যার নৃশংস ঘটনা, অন্যদিকে জনতার সহিংস প্রতিক্রিয়া—সব মিলিয়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী এখন চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।




