৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধির নতুন লক্ষ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের ৫৫তম এবং ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৃহস্পতিবার বিকেলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেট পেশ করা হয়। গত ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এটি নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
সরকারের দাবি, এই বাজেটের মাধ্যমে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকারের মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এই প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক সমস্যা মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, মে মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ অবস্থায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং সামষ্টিক অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে ১৩টি অগ্রাধিকার খাত চিহ্নিত করা হয়েছে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির জন্য ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া এবং কৃষকদের সার, বীজ ও প্রণোদনা সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের ঘোষণাও এসেছে বাজেটে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের উন্নয়নে ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তরুণ উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে ২২৫ কোটি টাকার ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিল’ গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকারের আশা, এই তহবিল নতুন ব্যবসা ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাব অনুযায়ী দেশের মাথাপিছু আয় বেড়ে ৩ হাজার ২০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের সফল বাস্তবায়নের জন্য রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন, অপচয় রোধ এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী এই বাজেট কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। এখন নজর থাকবে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনে এর ইতিবাচক প্রভাব কতটা পড়ে তার ওপর।




