যুদ্ধ, ভিসা সংকট ও রাজনৈতিক চাপের মাঝেও বিশ্বকাপ মিশনে ইরান
ক্রীড়া ডেস্ক:
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মাঠে নামার আগেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। যুদ্ধ পরিস্থিতি, কূটনৈতিক উত্তেজনা, ভিসা জটিলতা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের কারণে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ব্যাহত হওয়ায় দলটির সামনে তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করার পর ইরানের লক্ষ্য ছিল মাঠের প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। তবে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপের আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় দলটির অংশগ্রহণ ও প্রস্তুতি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ভিসা জটিলতা। শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড় এবং প্রয়োজনীয় সাপোর্ট স্টাফরা ভিসা পেলেও ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তেহরান, যারা বিষয়টিকে খেলাধুলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের উদাহরণ হিসেবে দেখছে।
ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে ইরান দলকে ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং খেলা শেষে দ্রুত দেশত্যাগ করতে হবে। ফলে পূর্বনির্ধারিত অ্যারিজোনা ক্যাম্প বাতিল করে তারা ফিফার অনুমোদনে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিজুয়ানাকে প্রস্তুতি ক্যাম্প হিসেবে বেছে নিয়েছে।
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ইরানের তিনটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হবে। এরপর একই শহরে বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবং সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে খেলবে তারা।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতাপূর্ণ। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের পর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় ফুটবল দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে।
বিশেষ করে ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছিল ইরান। সেই ম্যাচের আগে ইরানি ফুটবলারদের ফুল উপহার দেওয়ার দৃশ্য আজও ক্রীড়া ইতিহাসে সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়।
তবে এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। চলমান রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে সম্ভাব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচ কেবল ক্রীড়াঙ্গনেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দেশের অভ্যন্তরেও জাতীয় দলকে ঘিরে আগের মতো সর্বসম্মত সমর্থন দেখা যাচ্ছে না। ২০২২ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিক্ষোভ-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রভাব এখনো সমাজে বিদ্যমান। ফলে জাতীয় দলকে ঘিরে জনমতও কিছুটা বিভক্ত।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও ফুটবলপ্রেমী ইরানিদের আশা শেষ হয়ে যায়নি। দেশটির কোটি কোটি সমর্থক বিশ্বকাপে দলের সাফল্যের অপেক্ষায় রয়েছেন। সাতবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও কখনো নকআউট পর্বে উঠতে না পারা ইরান এবার ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে ইতিহাস গড়ার স্বপ্ন দেখছে।
কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—মাঠের পারফরম্যান্স কি যুদ্ধ, কূটনৈতিক সংকট, ভিসা জটিলতা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের সব আলোচনাকে ছাপিয়ে যেতে পারবে? ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই উত্তর খুঁজবে পুরো ফুটবল বিশ্ব।




