বাবা: পরিবারের নীরব বটবৃক্ষ, ভালোবাসার অনুচ্চারিত প্রতীক
নিজস্ব প্রতিবেদক:
শিশুর জীবনে প্রথম নিরাপদ আশ্রয়ের দুটি নাম—মা ও বাবা। মায়ের ভালোবাসা যেমন প্রকাশ্য ও দৃশ্যমান, বাবার ভালোবাসা তেমনি নীরব, গভীর এবং বিস্তৃত। তিনি কম কথা বলেন, নিজের কষ্ট খুব কমই প্রকাশ করেন, কিন্তু পরিবারের প্রতিটি স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও সাফল্যের পেছনে অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন একজন বাবা।
সন্তানের ছোটবেলায় বাবা তার হাত ধরে হাঁটতে শেখান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেখান জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করার কৌশল। অনেক সময় বাবার কঠোরতা সন্তানদের কাছে অপছন্দের মনে হলেও, পরিণত বয়সে এসে তারা উপলব্ধি করে—সেই কঠোরতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল গভীর মমতা, দায়িত্ববোধ এবং নিরাপত্তার চিন্তা।
সমাজে মায়ের ভালোবাসা ও ত্যাগ নিয়ে অসংখ্য গল্প, কবিতা ও আলোচনা থাকলেও বাবার অবদান অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়। অথচ পরিবারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজের স্বপ্ন, চাওয়া-পাওয়া ও ব্যক্তিগত আরাম বিসর্জন দেওয়ার ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা অনন্য।
বাবা দিবসের সূচনা
বাবাদের প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বিশেষ একটি দিবসের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নারী সনোরা স্মার্ট ডড। তাঁর মা মৃত্যুবরণ করার পর ছয় সন্তানকে একাই মানুষ করেছিলেন বাবা উইলিয়াম জ্যাকসন স্মার্ট। বাবার অসীম ত্যাগ ও সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করে বড় হওয়া সনোরার মনে প্রশ্ন জাগে—মায়েদের জন্য যদি একটি বিশেষ দিবস থাকতে পারে, তবে বাবাদের জন্য কেন নয়?
এই ভাবনা থেকেই তিনি বাবা দিবস চালুর উদ্যোগ নেন। শুরুতে নানা বাধা ও অনীহার মুখোমুখি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। স্থানীয় গির্জা, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে বাবার অবদানের বিষয়টি মানুষের সামনে তুলে ধরতে থাকেন।
অবশেষে তাঁর প্রচেষ্টার ফল আসে। ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথমবারের মতো বাবা দিবস উদযাপিত হয়। ছোট পরিসরের সেই আয়োজনই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ দিবসে পরিণত হয়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পথে
ক্রমশ জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকলে ১৯৬৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Lyndon B. Johnson জুন মাসের তৃতীয় রোববারকে বাবা দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানিয়ে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। পরে ১৯৭২ সালে Richard Nixon আইনে স্বাক্ষর করে দিবসটিকে জাতীয় স্বীকৃতি দেন।
বর্তমানে বিশ্বের বহু দেশে জুন মাসের তৃতীয় রোববার বাবা দিবস পালিত হয়। বিভিন্ন আয়োজন, শুভেচ্ছা ও উপহারের মাধ্যমে সন্তানরা এ দিনে বাবাদের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
একটি দিন কি যথেষ্ট?
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—একটি দিন কি একজন বাবার অবদানকে ধারণ করতে পারে? যে মানুষটি নিজের অপূর্ণ স্বপ্নগুলো সন্তানের সফলতায় পূর্ণ হতে দেখেন, যিনি পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের চাহিদাকে নীরবে বিসর্জন দেন, তাঁর অবদানের পরিমাপ কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ করা যায় না।
বাবা যেন এক বিশাল বটবৃক্ষ। তাঁর ছায়ায় সন্তানরা নিরাপত্তা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়। জীবনের ঝড়-ঝাপটার মধ্যেও তিনি পাহাড়ের মতো দৃঢ় হয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে বাবাকে বলা হয় না—“তোমাকে ভালোবাসি” কিংবা “তোমার জন্যই আজ আমি এই অবস্থানে পৌঁছেছি।” অথচ তাঁর নীরব উপস্থিতিই হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
ভালোবাসার ভাষা দায়িত্ব
বাবা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি ভালোবাসা, দায়িত্ব ও ত্যাগের এক অনন্য প্রতীককে স্মরণ করার উপলক্ষ। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের সেই অনুচ্চারিত নায়কদের কথা, যারা নিজের সুখ-দুঃখ আড়াল করে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে নিরলসভাবে কাজ করে যান।
বাবার ভালোবাসা অনেক সময় শব্দে প্রকাশ পায় না, কিন্তু তাঁর প্রতিটি দায়িত্ব, প্রতিটি ত্যাগ এবং প্রতিটি সংগ্রামই সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসার সাক্ষ্য বহন করে। তাই বাবা দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি বাবার অবদান উপলব্ধি করার, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক বিশেষ সময়।




