ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্বপ্ন নিয়ে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করা হচ্ছে। দেশের ৫৫তম এবং বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও ব্যাপক ব্যয় পরিকল্পনার কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকার আগামী অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতির সম্প্রসারণকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ধরা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। আগামী অর্থবছরে সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই আসবে কর ও রাজস্ব আহরণ থেকে। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজস্ব বাড়াতে করের হার বৃদ্ধির পরিবর্তে করভিত্তি সম্প্রসারণের কৌশল নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার সমন্বয় এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেটে সাধারণ মানুষের জন্যও বেশ কিছু স্বস্তির বার্তা রয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেলসহ ৬০টি কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সরকারের আশা, এর ফলে বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমবে।
স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর বিদ্যমান ভ্যাট ও অগ্রিম কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ডায়ালাইসিস রোগীদের ব্যয় কমবে। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সহায়ক যন্ত্র আমদানিতে শুল্ক ও কর অব্যাহতির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং আয় করমুক্ত রাখা, স্টার্টআপ উদ্যোগে কর সুবিধা প্রদান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। যুব উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণের কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ২৫ লাখ নাগরিককে ই-হেলথ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজেটের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা আশাব্যঞ্জক হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক অর্থায়ন সংগ্রহ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এই বাজেট দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতিপথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারের দাবি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলাই এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য।




