টিকার ঘাটতিতে শিশু মৃত্যুর মিছিল: সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ, ঘুমিয়ে ছিল ইউনূস সরকার
গাজী তুষার আহমেদ:
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটগুলোর একটি হয়ে উঠেছে টিকার ঘাটতি। সরকারি হিসাবেই হাম ও হামজনিত জটিলতায় প্রায় পাঁচ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ দাবি করেছে, তারা বহুবার অন্তর্বর্তী সরকারকে টিকার ঘাটতি, রোগ ছড়িয়ে পড়া এবং শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে আমলে নেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্যখাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সিদ্ধান্তহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত ভুলের এক নির্মম উদাহরণ; যার চরম মূল্য দিতে হয়েছে দেশের শিশুদের।
আগাম সতর্কবার্তা, তবুও ব্যবস্থা নেয়নি সরকার
ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল যে দেশে হামের এমআর-৫ টিকা, পোলিও, বিসিজি, টিডিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিকার মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, সময়মতো টিকা সংগ্রহ না করা হলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ভেঙে পড়বে এবং শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই সতর্কবার্তার পরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যখাতে এমন সংকটের ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের দেরিও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অথচ সরকার টিকা কেনার পুরোনো কার্যকর পদ্ধতি বাদ দিয়ে নতুন উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
পুরোনো পদ্ধতি বাদ, শুরু হয় বিপর্যয়
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা কিনে আসছিল। এতে কম খরচে দ্রুত টিকা পাওয়া যেত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে রাজস্ব বাজেটের আওতায় উন্মুক্ত দরপত্র চালু করে।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত ছিল বাস্তবতা বিবর্জিত। কারণ আন্তর্জাতিক টিকা সংগ্রহে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দ্রুত অনুমোদন ও বিশেষায়িত সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। উন্মুক্ত দরপত্রে যেখানে আট থেকে এগারো মাস সময় লাগে, সেখানে জরুরি টিকা সরবরাহে এমন প্রক্রিয়া কার্যত আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়ায়।
ইউনিসেফও বলেছে, এই পরিবর্তনের কারণেই টিকা পেতে বিলম্ব হয়েছে এবং তারা শুরু থেকেই এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল।
হাম ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে
টিকার সংকটের সুযোগে দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। সরকারি হিসাবে ১৫ মার্চ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৪৫১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হাম আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭৪ শিশু।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। কারণ গ্রামের অসংখ্য পরিবার হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতেই শিশুদের চিকিৎসা করিয়েছে। অনেক শিশুর মৃত্যু কোনো সরকারি তালিকায় ওঠেনি।
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের ভাষায়, “সরকারি হিসাব শুধু দৃশ্যমান মৃত্যুর সংখ্যা। প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
“দায় এড়ানোর সুযোগ নেই”
চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস ফর হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ বলেছে, এই মৃত্যুর দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। কারণ সংকটের আগেই সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল।
সংগঠনটির মতে, স্বাস্থ্যখাতে নীতিগত ভুল, ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তারা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও টিকা সংকটের ঝুঁকির কথা বলেছিলেন, তখন কেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি?
শিশুদের জীবন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা?
স্বাস্থ্যখাতের অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে নতুন ক্রয়নীতি চালু করা হয়েছিল। অথচ টিকা এমন একটি পণ্য, যেখানে সামান্য বিলম্বও প্রাণঘাতী হতে পারে।
একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন,
“টিকা কোনো সাধারণ পণ্য নয় যে দরপত্র ডাকলাম আর কয়েক মাস পরে পেলাম। এখানে প্রতিটি দিনের দেরি মানে শত শত শিশু ঝুঁকিতে পড়া।”
পরে শুরু হয় জরুরি অভিযান
পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে নতুন সরকার ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, গ্যাভি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে।
৫ এপ্রিল থেকে ৩০টি উচ্চঝুঁকির উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান অভিযান শুরু হয়। পরে তা জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়। প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে পরিচালিত এ কর্মসূচি ১০ মে নাগাদ প্রায় শতভাগ বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছায়।
বর্তমান সরকার আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রশ্ন রয়ে গেছে
তবে বড় প্রশ্ন এখনো থেকেই গেছে—যদি সময়মতো সতর্কবার্তা আমলে নেওয়া হতো, তাহলে কি এত শিশু মারা যেত?
স্বাস্থ্যখাত বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুধু স্বাস্থ্যনীতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। সেখানে সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার মূল্য সবচেয়ে বেশি দেয় সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা।
আজ দেশের বহু পরিবার তাদের সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো একটাই প্রশ্ন করছে—“এই মৃত্যু কি ঠেকানো যেত না?”




