নবজাতক মৃত্যু থেকে পরিকল্পিত ভাবে সাংবাদিক হামলা—বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল
গাজী তুষার আহমেদ :
- রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা। একদিকে হাসপাতালটিতে এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ঘটনার তদন্ত চলাকালেই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত তিনজন গণমাধ্যমকর্মী এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ভাঙচুরের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শনিবার বিকেলে হাসপাতালটি পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, হাসপাতালের কলেজ ভবনের অষ্টম তলায় একটি বেকারি কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই বেকারি থেকে নির্গত গ্যাস বা অন্য কোনো পরিবেশগত ঝুঁকি নবজাতকদের ক্ষতির কারণ হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে। মন্ত্রী জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং বেকারিটি সিলগালা করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরই বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা বেকারিটির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের জন্য হাসপাতালে যান। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রী হাসপাতাল ত্যাগ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই হাসপাতালের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাংবাদিকরা ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন এবং উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন সাংবাদিকরা হাসপাতালের নিচতলায় অবস্থান করে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের উপস্থিতিতেই হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি দল সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়। একপর্যায়ে ধাওয়া, হেনস্তা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে টাইমস অব বাংলাদেশের প্রতিবেদক কাজী জাহিদ, দীপ্ত টিভির এক ক্যামেরাপারসনসহ অন্তত তিনজন আহত হন। বৈশাখী টেলিভিশনের একটি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের অভিযোগ, নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্ন এবং বেকারি কারখানা নিয়ে অনুসন্ধান ঠেকাতেই সাংবাদিকদের ওপর পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। তারা দাবি করছেন, এটি শুধু সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা নয়, বরং তথ্য গোপনের একটি অপচেষ্টা হতে পারে। ফলে হামলার পাশাপাশি নবজাতক মৃত্যুর ঘটনাও একই তদন্তের আওতায় এনে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হয়েছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হামলার অভিযোগ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছে। হাসপাতালের পরিচালক সিদ্দিকুর রহমান দাবি করেন, সাংবাদিকদের ভিড়ের কারণে রোগীদের চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সাংবাদিকদের সরে যেতে অনুরোধ করলে একজন সাংবাদিক তাদের প্রতি অসম্মানজনক মন্তব্য করেন। এর জের ধরেই উত্তেজনা তৈরি হয়। যদিও তিনি স্বীকার করেন যে কর্মীরা সাংবাদিকদের ধাওয়া দিয়েছেন, তবে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এর আগে গত বুধবার হাসপাতালটির এনআইসিইউ ও সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু ঘটে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নিহত এক নবজাতকের বাবা হাবিবুর রহমান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় হাসপাতালের অবহেলা ও দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
নবজাতকদের মৃত্যু, হাসপাতাল ভবনে বেকারি কারখানার অস্তিত্ব এবং এরপর সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় আদ্-দ্বীন হাসপাতাল এখন তীব্র সমালোচনার মুখে। সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী এবং সচেতন নাগরিকরা হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নবজাতক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি হাসপাতাল যেখানে নবজাতকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে ধারাবাহিকভাবে এমন প্রশ্নবিদ্ধ ঘটনা ঘটায় জনমনে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এখন তদন্ত প্রতিবেদন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে—এই ঘটনার নেপথ্যের সত্য কত দ্রুত সামনে আসে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।




