হাম পরিস্থিতি ও শিশু মৃত্যু ঘিরে তীব্র উদ্বেগ—দায়বদ্ধতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
গাজী তুষার আহমেদ:
দেশে হামে ও এর উপসর্গে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামে একজন এবং উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৯২ জন এবং উপসর্গ নিয়ে আরও ৫৩৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২৮ জনে, যা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
আদালতে মামলা খারিজ, শুরু হয়েছে আলোচনা
শিশু মৃত্যুর এই ঘটনায় “দায়িত্বে চরম অবহেলা” অভিযোগ এনে দায়ের করা একটি মামলা সম্প্রতি ঢাকার একটি বিচারিক আদালত খারিজ করে দেয়।
মামলাটিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুস সহ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছিল।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলায় ঘটনার নির্দিষ্ট স্থান ও সময় উল্লেখ না থাকা, পর্যাপ্ত প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি এবং কিছু অভিযোগ সংশ্লিষ্ট আদালতের এখতিয়ারভুক্ত না হওয়ায় আবেদনটি গ্রহণ করা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত হওয়ায় সেগুলো এই আদালতে বিচারযোগ্য নয়—এ কারণেও মামলা খারিজ হয়।
জনমনে প্রশ্ন ও ক্ষোভ
মামলা খারিজের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—
এত বড় একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে কেন এখনো পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়নি?
অনেক নাগরিকের অভিযোগ, শিশু মৃত্যুর মতো গুরুতর ঘটনায় দায় নির্ধারণে ধীরগতি রয়েছে এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, আইনের শাসন বাস্তবায়নে সমতা থাকা উচিত, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান নয়।
তবে এসব মন্তব্য মূলত জনমত ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছে; এর পক্ষে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ বা রায় এখনো নেই।
সরকারের ব্যাখ্যা ও অবস্থান
সরকারি পর্যায়ে বলা হচ্ছে, বিষয়টি স্বাস্থ্যখাত ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে দেখা হচ্ছে। টিকাদান কার্যক্রম সম্প্রসারণ, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা জোরদার এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, কোনো ধরনের অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
“দায় রাষ্ট্র বহন করবে কি না”—নতুন বিতর্ক
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে উঠে এসেছে—এত বড় শিশু মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র বহন করবে কি না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দায় নির্ধারণের জন্য স্বচ্ছ তদন্ত, তথ্য-উপাত্ত যাচাই এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের একাংশ মনে করছে, দ্রুত বিচার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে জনআস্থা আরও কমে যেতে পারে।
“আইনের শাসন কোথায়”—জনমনে ক্ষোভ
মামলা খারিজের ঘটনায় কেউ কেউ আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আইনজীবীরা বলছেন, আদালত তার এখতিয়ার, প্রমাণ ও আইনি কাঠামোর ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এটিকে সরাসরি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
এদিকে কিছু মহলে দাবি উঠেছে, সরকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচনা করছে বলেই কঠোর অবস্থান নিচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের সংবেদনশীল স্বাস্থ্য সংকটে গুজব বা অনুমানভিত্তিক ধারণা না ছড়িয়ে বাস্তব তথ্য ও তদন্ত রিপোর্টের ওপর নির্ভর করাই গুরুত্বপূর্ণ।
হাম ও শিশু মৃত্যুর এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন শুধু স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন নিয়েও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া সামনে এগোলে প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।




