ফিশিং লিঙ্কের ফাঁদে সর্বস্ব হারাচ্ছেন মানুষ, ছয় মাসে প্রায় ৭ হাজার অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
মোবাইল ফোনে আসা একটি খুদে বার্তা, সঙ্গে একটি আকর্ষণীয় লিঙ্ক। পুরস্কার, ভাতা, সহজ ঋণ কিংবা লটারি জেতার প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারক চক্র মানুষকে ফাঁদে ফেলছে। কৌতূহলবশত কিংবা বিশ্বাস করে সেই লিঙ্কে ক্লিক করলেই শুরু হচ্ছে বিপদ। ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট কিংবা কার্ড থেকে অর্থ চুরি করছে সাইবার প্রতারকরা।
ঈদুল আজহার আগে গাইবান্ধার এক সরকারি চাকরিজীবী নারী মোবাইলে একটি লিঙ্কসহ খুদে বার্তা পান। বার্তায় দাবি করা হয়, তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কার ও ভাতা পেয়েছেন। পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি নিজের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব নম্বর দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর অ্যাকাউন্ট থেকে ২৫ হাজার টাকা উধাও হয়ে যায়।
এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। রাজধানীর মিরপুরের ব্যবসায়ী রাসেল সাবরিনও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হন। হোয়াটসঅ্যাপে আসা একটি লিঙ্কে ক্লিক করার পর প্রতারকদের কথামতো ভিসা কার্ডের তথ্য ও ওটিপি শেয়ার করেন তিনি। পরে দেখা যায়, তাঁর ব্যাংক হিসাব থেকে ৪৫ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব লিঙ্ক মূলত ফিশিং লিঙ্ক। এগুলোর মাধ্যমে প্রতারকরা ব্যবহারকারীদের ইমেইল, পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের তথ্য এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে। অনেক ক্ষেত্রে মোবাইলে ম্যালওয়্যার ইনস্টল করে পুরো ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেয় তারা।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী তানভীর হাসান জোহার মতে, ফিশিং লিঙ্কের মাধ্যমে শুধু আর্থিক তথ্য নয়, একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ও পেশাগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও চুরি করা সম্ভব। এমনকি ব্যবহারকারীর অজান্তে তাঁর ইমেইল বা মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণ করে অন্য অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও থাকে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতারক চক্র আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সময়ে হাজার হাজার মানুষের মোবাইলে এমন বার্তা পাঠাতে সক্ষম। বিভিন্ন মোবাইল টাওয়ারকে লক্ষ্য করে তারা লাখো গ্রাহকের কাছে ভুয়া বার্তা ও লিঙ্ক পৌঁছে দেয়।
যদিও প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তবে অধিকাংশ ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না। বিশেষ করে তুলনামূলক কম অঙ্কের অর্থ হারালে অনেকেই আইনি ঝামেলা এড়াতে বিষয়টি চেপে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোট ঘটনার ১০ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে মামলা বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করা হয়।
তবে অভিযোগের সংখ্যাও কম নয়। গত ছয় মাসে রাজধানীতে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগে প্রায় ৭ হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে এসেছে ৩ হাজার ৪৬৫টি অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ই-কমার্স প্রতারণা নিয়ে। এছাড়া বিনিয়োগ, চাকরি, ঋণ ও পার্সেল সেবার নামে প্রতারণার ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
সিআইডির মুখপাত্র বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন বলেন, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের অবশ্যই অভিযোগ করতে হবে। অভিযোগ না করলে প্রতারকদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে রাজধানীতে এআই ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা করার সুযোগকেও কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক চক্র। তারা বিআরটিএ বা ট্রাফিক বিভাগের নামে জরিমানার ভুয়া এসএমএস পাঠিয়ে মানুষকে ফিশিং লিঙ্কে প্রবেশ করতে উৎসাহিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি না থাকা ব্যক্তির কাছেও এমন বার্তা পাঠানো হচ্ছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহকদের সতর্কবার্তা পাঠাচ্ছে। ব্যাংকগুলো জানিয়েছে, কোনো সরকারি সংস্থা বা ব্যাংক কখনো এসএমএসের মাধ্যমে পিন, ওটিপি বা ব্যক্তিগত তথ্য চায় না। সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা এবং অচেনা ব্যক্তির কাছে কোনো তথ্য না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ভুলবশত কোনো ফিশিং লিঙ্কে ক্লিক করলে দ্রুত সব অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে হবে। প্রয়োজন হলে মোবাইল ফোন রিসেট করে অ্যান্টি-ম্যালওয়্যার সফটওয়্যার দিয়ে স্ক্যান করা উচিত। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকিতে পড়লে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা ও সতর্কতাই সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কোনো লোভনীয় প্রস্তাব, পুরস্কার বা জরিমানার বার্তা পেলেই যাচাই ছাড়া তাতে সাড়া না দেওয়াই নিরাপদ।




