বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু, পরে ‘জুলাই শহীদ’ দেখিয়ে হত্যা মামলা — সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক আসামি
নিজস্ব প্রতিবেদক :
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিজয় মিছিলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাওয়া হাফেজ আজিজুল ইসলামকে পরে “জুলাই শহীদ” হিসেবে দেখিয়ে হত্যা মামলা করা হয়েছে। প্রায় ১১ মাস পর দায়ের হওয়া ওই মামলায় স্থানীয় সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক মানুষকে আসামি করা হয়। তবে নিহতের পরিবার বলছে, এটি ছিল নিছক দুর্ঘটনা, কোনো হত্যাকাণ্ড নয়।
কী ঘটেছিল সেদিন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবরে পাটগ্রামে আনন্দ মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে অংশ নেন কোরআনের হাফেজ আজিজুল ইসলাম। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি ডিজিটাল সাইনবোর্ডে আঘাত করার সময় তিনি বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত জুলাই শহীদদের গেজেটে আজিজুল ইসলামের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১১ মাস পর হত্যা মামলা
২০২৫ সালে “জুলাইযোদ্ধা” পরিচয়ে মোশাররফ হোসেন নামে এক ব্যক্তি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাত ৫০ জনকে আসামি করা হয়। এদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির পাশাপাশি দুই সাংবাদিকও ছিলেন—
আজিজুল হক দুলাল
মামুন হোসেন সরকার
মামলার এজাহারে দাবি করা হয়, আন্দোলন ঠেকাতে বৈদ্যুতিক তার ফেলে দেওয়া হয়েছিল এবং তাতেই আজিজুল মারা যান।
পরিবারের বক্তব্য: “কেউ হত্যা করেনি”
নিহতের বাবা আব্দুর রহিম স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেছে এবং পরিবার কখনো হত্যা মামলা করতে চায়নি।
তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশি চাপ থাকলেও তারা মামলা করতে রাজি হননি। পরে জানতে পারেন, অপরিচিত এক ব্যক্তি বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
নিহতের মা রেজিয়া খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁর ছেলে “ভালো মানুষ” ছিল এবং নির্দোষ মানুষের ক্ষতি করে তিনি ছেলের আত্মার কষ্ট চান না।
সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ
মামলায় নাম আসার পর দুই সাংবাদিককে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়। পরে তদন্তে ঘটনাস্থলে তাঁদের উপস্থিতির প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা তাঁদের অব্যাহতির সুপারিশ করে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আদালতে জমা দেন।
সাংবাদিক আজিজুল হক দুলাল বলেন, তিনি ওই দিন পৌর শহরে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং প্রযুক্তিগতভাবেই তা যাচাই করা সম্ভব ছিল।
বাদীর বক্তব্য
মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন দাবি করেন, আন্দোলনের বিচার নিশ্চিত করার জন্যই মামলা করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের পরিবারই তাকে বাদী হতে অনুরোধ করেছিল। তবে পরিবার এই দাবি অস্বীকার করেছে।
মোশাররফ বর্তমানে জাতীয় যুবশক্তি-এর লালমনিরহাট জেলা সদস্যসচিব এবং “ওয়ারিয়র্স অব জুলাই” সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত।
তদন্তের বর্তমান অবস্থা
পুলিশ জানিয়েছে—
মামলায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন
লাশ উত্তোলনের জন্য আদালতে আবেদন করা হয়েছে
তদন্ত চলমান রয়েছে
সহকারী পুলিশ সুপার জয়ন্ত কুমার সেন বলেন, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কেন ঘটনাটি আলোচনায়?
এই ঘটনাকে ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কি রাজনৈতিক মামলায় ব্যবহার করা হয়েছে?
পরিবারের অমতে হত্যা মামলা কতটা গ্রহণযোগ্য?
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল?
“জুলাই শহীদ” তালিকা প্রণয়নে যাচাই কতটা নির্ভুল ছিল?
ঘটনাটি এখন স্থানীয় রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও সাংবাদিক নিরাপত্তা—তিনটি ক্ষেত্রেই ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।




