শিক্ষকের মর্যাদায় আঘাত: শ্রেণিকক্ষে নারী শিক্ষককে মারধর, ক্ষোভে বিদ্যালয় ছাড়ার ঘোষণা
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি:
টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে শ্রেণিকক্ষের ভেতরেই এক নারী শিক্ষককে থাপ্পড় ও ঘুষি মারার ঘটনায় শিক্ষক সমাজ ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলেও বিচার প্রক্রিয়ায় সন্তুষ্ট নন ভুক্তভোগী শিক্ষক। ন্যায়বিচার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বিদ্যালয়ে আর ফিরে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার ডা. শওকত আলী ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। জানা যায়, এনটিআরসিএর মাধ্যমে ইংরেজি বিষয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ওই শিক্ষক প্রায় ছয় মাস আগে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। গত সোমবার দুপুরে শ্রেণিকক্ষে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাকে শাসন করতে একটি থাপ্পড় দেন শিক্ষক। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিক্ষার্থীটি শিক্ষকের ওপর চড়াও হয়ে কয়েকটি থাপ্পড় ও ঘুষি মারে।
ঘটনার সময় শ্রেণিকক্ষে অন্যান্য শিক্ষার্থী ছাড়াও তিনজন শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষক আনিছুর রহমান বলেন, তিনি পুরো ঘটনার সাক্ষী এবং ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে শাসন করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে এর আগেও ছাত্রীদের উত্যক্ত করার অভিযোগ উঠেছিল। তবে সে সময়ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বাবা সবুর মিয়া একই বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।
ঘটনার দুই দিন পর বুধবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও শিক্ষক সমিতির নেতাদের উপস্থিতিতে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং তার বাবার বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি শিক্ষার্থীকে ভুক্তভোগী শিক্ষকের কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয়।
তবে এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে স্থানীয়দের একাংশ প্রতিবাদ জানায়। সালিশ বৈঠকে ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানও দেওয়া হয়। এতে এলাকায় উত্তেজনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষক অভিযোগ করেন, ঘটনার পর তাঁর দুই সহকর্মী অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন এবং বিষয়টি আর না বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যেখানে শিক্ষকরা শিক্ষককে সম্মান দেন না, শিক্ষার্থীরাও সম্মান করতে শেখে না। এমন পরিবেশে আমি আর ফিরে যেতে চাই না।”
অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষক রোকেয়া আক্তার বলেন, বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোশারফ হোসেন জানান, সালিশে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদ ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণ করা হবে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জানতেন না; পরে বিষয়টি শুনে বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন।
এদিকে বিদ্যালয়টির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমাদুল হাসান জানিয়েছেন, কোনো শিক্ষক তাঁকে বিষয়টি অবহিত করেননি। তবে তিনি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘটনাটি শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা এবং শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে।




