পাবনায় রক্তাক্ত এক সপ্তাহ: ৭ দিনে ৭ খুন, আতঙ্কে ঘরবন্দি মানুষ
পাবনা প্রতিনিধি:
পাবনায় মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে সাতজনের মৃত্যু এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সহিংস ঘটনায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন নিরাপত্তাহীনতার ছাপ স্পষ্ট। সন্ধ্যা নামলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উৎকণ্ঠা চরমে পৌঁছেছে।
জানা গেছে, গত সাত দিনে পৃথক ঘটনায় চরমপন্থি সংগঠনের সদস্য, কলেজছাত্র, স্কুলছাত্রী এবং সাধারণ নাগরিকসহ মোট সাতজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
একই দিনে দুই খুনে চাঞ্চল্য
গত ৮ জুন পাবনা শহরে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ঘটে দুটি হত্যাকাণ্ড। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সদর উপজেলার গয়েশপুর ইউনিয়নের জাফরাবাদ এলাকায় চরমপন্থি সংগঠন নকশালের সদস্য হিসেবে পরিচিত আলী হোসেন (৫০) দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। শহরের মাসুম বাজার এলাকার জামেয়া আশরাফিয়া মাদ্রাসার সামনে দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে বিকেল ৫টার দিকে শহরের বাস টার্মিনাল এলাকায় কলেজছাত্র মনিরুল ইসলাম (২০) ছুরিকাঘাতে নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, রাকিব (২২) নামের এক যুবক তাকে ছুরিকাঘাত করেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্তকে আটক করে।
ধর্ষণের পর স্কুলছাত্রীকে হত্যা
এর আগে ৩ জুন ভাড়ারা ইউনিয়নের পূর্ব রাঘবপুর গ্রামের নবম শ্রেণির ছাত্রী রিয়া খাতুনকে (১৫) ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। হত্যার পর তার মরদেহ বস্তাবন্দি করে পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে নদীর তীর থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
এই নির্মম ঘটনার প্রতিবাদে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ৪ জুন রিয়ার দাফনের পর বিক্ষুব্ধ জনতা অভিযুক্ত নাঈমের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় ঘরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে কয়েকজন গুরুতর দগ্ধ হন।
অগ্নিকাণ্ডে আরও তিন প্রাণহানি
সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দগ্ধদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুমন শেখ (৩৫), সাইফুল ইসলাম সাব্বির (২০) ও সাপু (২১)। তাদের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
মানসিক হাসপাতালে রোগী খুন
গত ২ জুন পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডেও ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। গভীর রাতে দুই রোগীর মধ্যে সংঘর্ষে ইনজামুল হক (২৬) নামে এক রোগী নিহত হন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অবস্থায় সিরাজগঞ্জের নাজমুল (২৮) ও ইনজামুলের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এতে মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ইনজামুল।
নিরাপত্তাহীনতায় অভিভাবকরা
একের পর এক হত্যাকাণ্ডে জেলার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ তীব্র হয়েছে।
শহরের শালগাড়িয়া এলাকার বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম বলেন,
“দুই মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি। নিজের কাজের ক্ষতি হলেও আমি নিজেই তাদের স্কুল ও কোচিংয়ে আনা-নেওয়া করছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে কাউকেই নিরাপদ মনে হচ্ছে না।”
চরমপন্থি ও কিশোর গ্যাং নিয়ে উদ্বেগ
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর জেলায় চরমপন্থি তৎপরতা এবং কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয়তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
পুলিশের বিশেষ অভিযান
পাবনার পুলিশ সুপার ছুফি উল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, আলী হোসেন হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সন্ধ্যার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।”
চরমপন্থিদের পুনরুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রোজার ঈদের পর পোস্টারিংয়ের খবর পাওয়া গেলেও বাস্তবে কোনো পোস্টার উদ্ধার করা যায়নি। তারপরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
আতঙ্ক কাটছে না
পুলিশের আশ্বাস সত্ত্বেও জেলার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাটছে না। মাত্র এক সপ্তাহে সাতটি প্রাণহানির ঘটনায় পাবনাজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন
এই সংস্করণটি সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশযোগ্য ঢংয়ে আরও বিস্তারিত ও আকর্ষণীয় করে লেখা হয়েছে।




