যৌথ বাহিনীর আগাম তথ্য ফাঁস:ধরাছোঁয়ার বাইরে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা;ধরা হলো চুনোপুঁটি
খুলনা প্রতিনিধি:
খুলনা মহানগরীতে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা ও বিভিন্ন অপরাধ দমনে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চললেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। গত চার দিনে ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বড় অপরাধীদের আটক করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরুর আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) নেতৃত্বে পুলিশ, র্যাব ও এপিবিএনের সমন্বয়ে গত ৩ জুন থেকে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। কেএমপি সূত্রে জানা যায়, অভিযানের প্রথম দিনে ৬২ জন, দ্বিতীয় দিনে ৫৯ জন এবং তৃতীয় দিনে ৬৩ জনসহ মোট ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে মাদক কারবারি, ছিঁচকে চোর এবং বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা রয়েছেন। এছাড়া তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী কসাই লিটন ও আজম খানকে আটক করা হলেও বড় সন্ত্রাসী চক্রের প্রধানদের কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যৌথ বাহিনীর অভিযানের আগাম খবর অপরাধীদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে অভিযান শুরুর আগেই তারা নিরাপদ স্থানে সরে যায়। নগরীর ময়লাপোতা এলাকার বাসিন্দা হুমায়ুন কবীর বলেন, সন্ধ্যার পর বিভিন্ন মোড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযান দেখা গেলেও বড় কোনো সন্ত্রাসী ধরা পড়ার খবর পাওয়া যায়নি। মাদক ব্যবসায়ীরা সাময়িকভাবে গা ঢাকা দিলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার আগের মতো কার্যক্রম শুরু করে।
শেখপাড়া চামড়াপট্টি এলাকায় সম্প্রতি পরিচালিত এক অভিযানে সামান্য পরিমাণ গাঁজাসহ দুজনকে আটক করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত মাদক সরবরাহকারী ও গডফাদাররা আগেই এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ায় তারা ধরা পড়েনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, বিশেষ অভিযান চলার মধ্যেও নগরীতে খুন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, অপরাধীদের কাছে অভিযানের তথ্য পৌঁছে যাওয়াই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেএমপি কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান জানিয়েছেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে লিটন, রিফাত, আজম খান ও রাব্বিসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী রয়েছে। বাইরে থেকে এসে অপরাধ সংঘটনকারীদের ঠেকাতে নগরীর প্রবেশপথে চেকপোস্টও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত অপরাধীদের ওপর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, প্রতিদিন কোথাও না কোথাও গোলাগুলি, চাঁদাবাজি কিংবা অপহরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “খুলনা এখন আতঙ্কের শহরে পরিণত হয়েছে।” তিনি সন্ত্রাস দমনে পুলিশের আরও সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব বাবুল হাওলাদারও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশের কাছে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা থাকা সত্ত্বেও মূল হোতাদের বদলে ছোটখাটো অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও তাদের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সফলতা না এলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
খুলনা মহানগর পুলিশের অপরাধ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ৮৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৪টি হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিতে আটটি থানাভিত্তিক নতুন সন্ত্রাসী তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে ১৮১ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, চলমান বিশেষ অভিযান কেবল চুনোপুঁটি নয়, বরং শীর্ষ সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী অপরাধী ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে। অন্যথায় খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




