রামেকের গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য: শিশুদের শরীরে অকার্যকর হয়ে পড়ছে অধিকাংশ অ্যান্টিবায়োটিক
রাজশাহী প্রতিনিধি :
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ) পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের শরীরে ব্যবহৃত প্রায় ৯৬ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে চিকিৎসকদের হাতে কার্যত ‘শেষ ভরসা’ হিসেবে রয়ে গেছে মাত্র দুটি শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক—টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাস ধরে পরিচালিত এই গবেষণায় পিআইসিইউতে ভর্তি ৪৯ জন শিশুর শরীর থেকে জীবাণুর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণাটি পরিচালনা করেন রামেক হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। গবেষণায় অংশ নেন আরও কয়েকজন চিকিৎসক ও গবেষক। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনে।
গবেষণায় দেখা যায়, সংগৃহীত ৪৯টি জীবাণুর মধ্যে ৩০টি ছিল গ্রাম-নেগেটিভ এবং ১৯টি গ্রাম-পজিটিভ। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে পাওয়া প্রতিটি গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুই প্রথম সারির ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া জীবাণুর মধ্যে রয়েছে অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি কমপ্লেক্স, যা মোট নমুনার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এছাড়া ক্লেবসিয়েলা নিউমোনিয়া, স্ট্যাফাইলোকক্কাস হিমোলিটিকাস, ই. কোলাই, সুডোমোনাস অ্যারুজিনোসা, সেরাশিয়া মারসেসেন্স ও অন্যান্য জীবাণুও পাওয়া গেছে।
গবেষণায় গ্রাম-নেগেটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে ইমিপেনেম, মেরোপেনেম, পাইপেরাসিলিন-টাজোব্যাক্টাম, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, জেন্টামাইসিন ও অ্যামিকাসিনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধের হার ৯০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে টাইজেসাইক্লিন ও কলিস্টিন এখনও তুলনামূলক কার্যকর থাকলেও সেগুলোর বিরুদ্ধেও ধীরে ধীরে প্রতিরোধ গড়ে ওঠার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
গ্রাম-পজিটিভ জীবাণুর ক্ষেত্রে লাইনেজলিড, ড্যাপটোমাইসিন ও টাইজেসাইক্লিন শতভাগ কার্যকর থাকলেও টেইকোপ্লানিনের বিরুদ্ধে নতুন করে প্রতিরোধ দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অ্যারিথ্রোমাইসিনের বিরুদ্ধে শতভাগ জীবাণুই প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের হার দ্রুত বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সংগৃহীত জীবাণুর মধ্যে যেখানে প্রথম সারির অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ, সেখানে এপ্রিল মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ শতাংশে। গবেষকেরা এটিকে হাসপাতালজুড়ে প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারের গুরুতর সংকেত হিসেবে দেখছেন।
৪৯ জন শিশুর মধ্যে ৩৪ জন আগে থেকেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেছিল। তাদের মধ্যে বহুঔষধ-প্রতিরোধী (এমডিআর) জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি অন্য শিশুদের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি পাওয়া গেছে। এছাড়া দীর্ঘ সময় ভেন্টিলেশনে থাকা, দীর্ঘদিন পিআইসিইউতে ভর্তি থাকা এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত থাকাও ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এমডিআর জীবাণুতে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে গড়ে ১৪ দিন সময় লাগে, যেখানে সাধারণ সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের সুস্থ হতে লাগে প্রায় ৬ দিন। অর্থাৎ প্রতিরোধী জীবাণুর কারণে চিকিৎসার সময় ও জটিলতা উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে গবেষকদের মতে, এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি হাসপাতালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়েছে এবং নমুনার সংখ্যাও তুলনামূলক কম। পাশাপাশি জীবাণুর জিনগত বিশ্লেষণ করা হয়নি, ফলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠার নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
গবেষকরা অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার বন্ধ করা, হাসপাতালগুলোতে কঠোর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হাত ধোয়া ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত রাখার নিয়ম মেনে চলা এবং কলিস্টিন ও টাইজেসাইক্লিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক সীমিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। একই সঙ্গে সারা দেশে এ ধরনের পরিস্থিতি রয়েছে কি না তা জানতে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত গবেষণা ও নজরদারির আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
গবেষক দলের প্রধান ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, পিআইসিইউতে শিশুদের শরীরে একের পর এক অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতেই এই গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। তাঁর মতে, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় এমন পরিস্থিতি এড়াতে শিশুদের সঠিক পরিচর্যা ও সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।




