আর্দ্রতার ফাঁদে হাওরের কৃষক: সরকার নির্ধারিত দাম থেকেও বঞ্চিত চাষিরা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এবার বোরো মৌসুম যেন আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা আর সরকারি খাদ্যগুদামের কঠোর আর্দ্রতার শর্তে বিপাকে পড়েছেন হাজারো প্রান্তিক কৃষক। উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামেও ধান বিক্রি করতে না পেরে চরম লোকসানের মুখে পড়েছেন তাঁরা। অনেকেই ঋণ শোধ করতে বাধ্য হয়ে পানির দরে ধান বিক্রি করছেন।
কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, পানিতে তলিয়ে যাওয়া জমি থেকে কষ্ট করে ধান কাটলেও রোদ না থাকায় তা শুকাতে পারছেন না কৃষকেরা। সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দিতে গেলে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ অধিকাংশ ধানে এখন আর্দ্রতা ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। ফলে গুদাম থেকে ধান ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার বড়িবাড়ি এলাকার কৃষক শওকত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“খেতে পানি জমে আছে। অনেক কষ্টে ধান কেটে আনছি। কিন্তু রোদ নাই, শুকামু কই? গুদামে নিলে কয় ধান ভেজা। এখন বাজারে ৫০০-৬০০ টাকায় মণ বিক্রি করতেছি।”
তিনি জানান, ধান চাষ থেকে শুরু করে কাটা, মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন মিলিয়ে প্রতি মণে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ টাকা। অথচ বাজারে সেই ধান বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেকেরও কম দামে।
মাঠপর্যায়ের তথ্যে দেখা গেছে, এবার প্রতি একরে গড়ে ৭০ মণ ফলন হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান ঘরে তুলতেই কৃষকের নাভিশ্বাস উঠেছে। জলাবদ্ধ জমিতে শ্রমিক সংকট তীব্র হওয়ায় ধান কাটার মজুরি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একরপ্রতি ধান কাটতে ৫০০-৬০০ টাকা লাগত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায়।
অন্যদিকে মাড়াই, ঝাড়াই ও পরিবহন খরচও কয়েকগুণ বেড়েছে। আগে যেখানে এসব খাতে ৮-১০ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন তা ২০-২৫ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ফলে প্রতি মণে উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৫৪ টাকা। কিন্তু বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। এতে প্রতি মণেই কৃষকদের লোকসান হচ্ছে ৩০০ থেকে ৭৫০ টাকার বেশি।
সরকার প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও বাস্তবে সেই সুবিধা পাচ্ছেন না কৃষকেরা। অভিযোগ উঠেছে, খাদ্যগুদামে আর্দ্রতা পরীক্ষা, ব্যাংক হিসাব ও নানা প্রশাসনিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়া চক্র কম দামে ভেজা ধান কিনে নিচ্ছে। পরে সেই ধান শুকিয়ে সরকারি গুদামে বেশি দামে সরবরাহ করছে তারা।
ইটনা উপজেলার কৃষক আকরাম হোসেন বলেন,
“গুদামের সামনে ধান নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। পরে ধান পছন্দ না হলে আবার বাড়ি নিয়ে আসতে হয়। এতে পরিবহন খরচই বাড়ে, লাভ তো দূরের কথা।”
এদিকে সুনামগঞ্জের কৃষকদের অবস্থাও ভয়াবহ। জামালগঞ্জ উপজেলার কালীপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আলী আমজাদ জানান, তিন কিয়ার জমিতে চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে ৩০ হাজার টাকার বেশি। কিন্তু উৎপাদিত ধান এখন ৮০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শুধুমাত্র ঋণ শোধ করার জন্য।
হালি হাওরের বড় কৃষক আয়না মিয়া বলেন,
“এক কিয়ার জমি চাষ করতে ৬-৭ হাজার টাকা খরচ। কাটাইতে ৩ হাজার টাকা। পরে খলায় আনা, গোলায় তোলা—সব মিলাইয়া মণপ্রতি খরচ ১,২০০-১,৩০০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০০ টাকায়। এইবার অনেকের না খাইয়া থাকার অবস্থা হইব।”
খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জে ১৮ হাজার ৩৩০ টন এবং সুনামগঞ্জে ২১ হাজার ৩৪৯ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বৈরী আবহাওয়া ও আর্দ্রতার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, কৃষকদের কোনো ধরনের হয়রানি সহ্য করা হবে না। কেউ সমস্যায় পড়লে সরাসরি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন একটাই—যে ধান বৃষ্টির কারণে শুকানোই সম্ভব হচ্ছে না, সেই ধানের জন্য ১৪ শতাংশ আর্দ্রতার শর্ত দিয়ে সরকার আসলে কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে? হাওরের কৃষকেরা বলছেন, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে এবার হাজারো পরিবার ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়ে যাবে।




